রূপবান। দর্শক নন্দিত চলচ্চিত্র। দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। সালাউদ্দিন পরিচালিত এই সিনেমাটি ১৯৬৫ সালের ৫ নভেম্বর মুক্তি পায়। তৎতকালীন সময়ে উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রের যখন জয়জয়কার তখন এ নির্মাতা ঠিক তার বিপরীত স্রোতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে তৈরি করেছিলেন ছবিটি।
একের পর এক যখন বাংলা চলচ্চিত্র লোকসান গুণতে গুণতে পেরেসান ঠিক তখন এই চলচ্চিত্রটি ব্যবসায়িকভাবে সাফল্যের ইতিহাস গড়ে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয় ছবিটি। মানুষ দল বেঁধে রূপবান দেখার জন্য সিনেমা হলে ছুটে আসেন। ছবিটি অধিকাংশ বাঙালিকে প্রেক্ষাগৃহে দেখার আগ্রহ তৈরি করে বলেও চলচ্চিত্র গবেষকদের তথ্য মতে জানা যায়।
সালাউদ্দিনের চিত্রনাট্যে এ চলচ্চিত্রের চিত্রধারণ করেন আব্দুস সামাদ। সংগীতায়োজনে ছিলেন সত্য সাহা। আর বিভিন্ন চরিত্র রূপায়ন করেন গুণী অভিনয়শিল্পী সুজাতা, মান্নান, চন্দনা, সিরাজুল ইসলাম, রহিমা খাতুন, আনিস প্রমুখ।
উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রের স্রোতে যখন বিপন্ন বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র তখন লোকজ যাত্রার কাহিনী থেকে পরিচালক সালাউদ্দিন নির্মাণ করেন রূপবান। রূপবানের সাফল্য দেখে লোকজ কাহিনীর প্রতি ঝুঁকে পড়েন নির্মাতারাও। এ চলচ্চিত্রটির এহেন সাফল্য ও জনপ্রিয়তার কারণও ব্যক্ত করেছেন চলচ্চিত্র গবেষকরা। এতে গল্প ছাড়াও চলচ্চিত্রটিতে ব্যবহৃত যাত্রার গানের চিত্রায়ন করা হয়েছিল। গানগুলো পূর্বেই যাত্রায় ব্যবহারের ফলে লোকসমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এ সিনেমার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে গানের ভূমিকা ছিল বলেও জানা যায়।
তবে যে কারণেই চলচ্চিত্রটি মানুষের মনের দোয়ারে পৌঁছে থাক না কেন, তা যে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছিল নির্দ্বিধায় তা স্বীকার করতেই হবে।
আশির দশকের শেষ বেলায় মুক্তি পায় তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত বেদের মেয়ে জোসনা চলচ্চিত্রটি। এ দশকের সর্বশেষ সফল সিনেমা এটি। জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ও অঞ্জু ঘোষ অভিনীত এ চলচ্চিত্রটি তৎকালীন সময় ১৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। সিনেমাটি নির্মাণে খরচ হয়েছিল ২৫ লাখ টাকা।
কল্পিতলোক কাহিনী নির্ভর বা রূপ কথাভিত্তিক মিশ্ররিতির কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয়েছিল চলচ্চিত্রটি। এ সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম ছিল জোসনা। প্রকৃতপক্ষে জোসনা বেদে কন্যা নয়। সে ছিল কাজীর মেয়ে। শৈশবে সাপ দংশন করলে তাকে ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাক্রমে কাজী কন্যা উপস্থিত হয় বেদেপল্লীতে। বেদে সংস্কৃতির আবহে লালিত পালিত হয় সে। সময়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠে জোসনা। বেদের মেয়ে জোসনার কাহিনী এগিয়ে চলে নৃত্যগীতির সঙ্গে। যে নৃত্যের মধ্যে শিল্পের চেয়ে নারীদেহের অশৈল্পিক অঙ্গভঙ্গির প্রকাশ বেশি ছিল।
এতে বেদে সম্প্রদায়ের লৌকিক অতিলৌকিকত্ব যেমন প্রবাহমান তেমনি ধর্মও একটি বৃহৎ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তা ছাড়া জনসংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মীয় সংযোগের মাধ্যমে রাজনীতির সংশ্লেষ কিংবা শ্রেণি নির্ণয়ের দ্বান্দ্বিক প্রশ্নে রাজনীতি ও সমাজনীতি নানা মাত্রায় ক্রিয়াশীল। এ জন্য জোসনাকে দেখে সাধারণ মানুষ যেন তাদেরই প্রতিনিধির সন্ধান পায়। জন সাধারণের কাছে আসার কারণেই এ চলচ্চিত্রটি ব্যবসায়িকভাবে এতটা সফল হয়েছিল।
তোজাম্মেল হকের কাহিনী, চিত্রনাট্যে এ চলচ্চিত্রে আরো অভিনয় করেন গুণী অভিনয়শিল্পী মিঠুন, ফারজানা ববি, রওশন জামিল, নাসির খান, প্রবীর মিত্র, দিলদার প্রমুখ। চিত্রগ্রহণে ছিলেন জাকির হোসেন। সংগীতায়োজনে ছিলেন আবু তাহের।
তারপর চলে গেছে অনেকটা সময়। প্রজন্ম পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে গেছে মানুষের রুচি, ভালো লাগা মন্দ লাগা। হীরালাল সেনের সেই বায়োস্কোপ কিংবা অ্যানালগ সিনেমা হলের পর্দা, কাঠের বেঞ্চে ছারপোকার ছড়াছড়ি নেই। তবে হারিয়ে গেছে মফস্বলের অনেক টিনের চালার প্রেক্ষাগৃহ। হারিয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী দিনগুলো।
মানুষ এখন হলিউড বলিউডের ব্যায়বহুল চকচকে ডিজিটাল চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করে। তবে পরিবর্তন হয়েছে ঢাকাই চলচ্চিত্রেরও। বাংলা চলচ্চিত্র এখন নির্মিত হচ্ছে ডিজিটালভাবে। তারপরও এখনও মানুষকে রূপবানের মতো সিনেমা হলে টেনে নিতে পারেনি। সময়পোযোগী একটি বেদের মেয়ে জোসনা তৈরি হয়নি। যা থেকে ১৫ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। এতটা না হোক ব্যায়কৃত অর্থটাও তো ফেরত আসার মতো কিছু একটা হতে পারে! তাতে অন্তত বেঁচে থাকবে বাংলা চলচ্চিত্র।
আমরা কী আরেকটি রূপবান নির্মাণ করতে পারি না ? যা দেখার জন্য আবারও সবাই ছুটবে প্রেক্ষাগৃহে। দল বেঁধে মানুষ গ্রাম থেকে ছুটে আসবে মফস্বল শহরে সিনেমা দেখার জন্য। সেদিনের অপেক্ষায়!
প্রকাশক - ফারুক আহমেদ, যোগাযোগ : হাজী এম.এ গফুর স্কয়ার মার্কেট, দ্বিতীয় তলা , ষ্টাফ কোয়ার্টার, ডেমরা, ঢাকা- ১৩৬০। ফোন:০২ ৯৩৪৭৬৯, মোবাইল :০১৭৬১৮৮৫৯১৫,০১৯১২৭৭১০৫৪,০১৮১০১২৭২০৯, ইমেইল:banglarkhabar24@gmail.com, তথ্য মন্ত্রনালয় নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল, নিবন্ধন নম্বর: ৫৪.
বাংলার খবর মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান