
‘৪৪ বছর ধরি সিগারেট খাইয়া যাইরাম। ব্যামার (অসুখ) অইলে ডাক্তরর দার যাই, ডাক্টর কয়-সিগারেট খাইতাম না। কে হুনে কার কথা।’ সিগারেট না ছাড়লে তো ক্ষতি হবে, লোকজন মন্দ বলবে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইতা মাতিয়া লাব নাই। আমার পুয়ার লাগি সিগারেট খাওয়া ধরছি। যেদিন আমি থাকতাম না হিদিন মহসিন আলীর সিগারেট খাওয়া শেষ অইব।’ সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় এভাবেই নিজের সিগারেট খাওয়ার কথা বর্ণনা করলেন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দফতরে বসে মধ্যাহ্ন ভোজনের পর এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা বলেন। নিজের সিগারেট খাওয়ার পেছনে ‘আত্মজ’ হারানোর এক করুণ গল্প যে লুকিয়ে রয়েছে তা প্রকাশ করলেন তিনি। এ গল্প বলার সময় মন্ত্রীর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। এক পর্যায়ে কিছুক্ষণ কোনো কথাই বলতে পারেননি। ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে ছিলেন খানিকক্ষণ। মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র থাকার সময় তিনি ‘চেইন স্মোকার’ ছিলেন। মন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি সিগারেট ছাড়েননি। সর্বশেষ গত ৯ জুন রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় সবার সামনে ফের সিগারেট খেয়ে আলোচনায় আসেন সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য। এরপর থেকেই সৈয়দ মহসিন আলীর সিগারেট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ‘পুয়ার লাগি’ সিগারেট খাওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার বড় ছেলে ও তিনি এক সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ‘যুদ্ধের শেষদিকে পাঞ্জাবি সেনারা তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। পাঞ্জাবিরা আমিসহ আমার সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধানের জন্য ছেলেকে নির্যাতন করে। কিন্তু নির্যাতনের পরও ছেলে মুখ খোলেনি। ’ এই বীরত্বের জন্য নিজের ছেলেকে ‘বাপের বেটা’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘হিদিন যদি নির্যাতনের ডরে পুয়ায় আমিসহ আমার সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম কইলাইতো তা অইলে আমরা সব খতম অই যাইতাম। তিনি বলেন, নাম না কওয়ার অপরাধে পুয়ারে পাঞ্জাবিরা মারি লাইছে। যদি নাম কইতো তা অইলে আমিসহ ২০০ জন মুক্তিযোদ্ধারে মারি লাইত পাঞ্জাবিরা। নিজে মরিয়া আমরারে বাঁচাইয়া দিছে। এর বাদে পুয়ার লাগি টেনশন অইতে লাগল। আর টেনশন কমাইবার লাগিয়া সিগারেট খাইতে শুরু যে করলাম, তা ওখনও আছে।’ গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ইস্কাটনে জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদের ৩৯তম সভায় এ ঘটনা ঘটে বলে সভায় অংশগ্রহণকারী একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সভায় এভাবে ধূমপান শান্তিযোগ্য অপরাধ। তবু ওই দিন ১২টা ৪০ মিনিটে মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী এসে সভাপতির আসন নেন। বৈঠক শুরু পর দু-এক মিনিট কথা বলেই উপস্থিত সবার উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘স্মোক (ধূমপান) ছাড়া আমার কাজ করতে অসুবিধা হয়, আপনারা কি স্মোক করার অনুমতি দিবেন? যদি অনুমতি দিতেন তাহলে স্মোক করতাম।’ এটুকু বলে কারো অনুমতির অপেক্ষা না করেই পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে ফুস করে ধোঁয়া ছাড়লেন সভাপতির আসনে বসা মন্ত্রী। এ সময় বৈঠকে উপস্থিত সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন, মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিকুল ইসলাম এবং যুগ্ম সচিব বেগম নাসরিন আরা সুরত আমিন বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে উসখুশ করতে থাকেন। এভাবে অস্বস্তির মধ্য দিয়েই চলতে থাকে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। অবশ্য বৈঠক শেষ হওয়ার আগেই মন্ত্রী জরুরি কাজের কথা বলে উঠে চলে যান। এর আগে মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী গত বছরের ২৭ জানুয়ারি সিলেট বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের-২০১৩ সালে জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসে ধূমপান করেন। এটি নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সমালোচনার মুখে তিনি ক্ষমা চান। প্রবাসী ও চা বাগান অধ্যুষিত সিলেটসহ মৌলভীবাজারে বিভিন্ন সভার মঞ্চে বসেই প্রকাশ্যে ধূমপান করে ব্যাপক সমালোচিত সৈয়দ মহসিন আলী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই আওয়ামী লীগ নেতা এলাকায় জনপ্রিয় হলেও বর্তমানে তার ব্যক্তিগত আচার-আচরণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তার দলের নেতাকর্মীদের কাছেও সমালোচনার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। বিশেষ করে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে দেয়া বিভিন্ন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অপ্রীতিকর মন্তব্য করতে শুরু করেন। এমনকি বিএনপি ও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উদ্দেশ করে অশোভন ভাষায় বিষোদগার করে নিজ দলেই অজনপ্রিয় হয়ে পড়েন তিনি। গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাজনগরে তাকে দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় মন্ত্রী বলেন, ‘সাংবাদিক ভাইয়েরা সাংবাদিকতা করছেন, আপনাদের আর কোনো কাজ নেই? খালেদা জিয়া-তারেক রহমান কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন সেদিকে আপনাদের খেয়াল নেই। তাতে কোনো দোষও নেই। সব দোষ হলো মহসিন আলীর, সিগারেট খায়।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, গত সোমবার (১১ ফেব্রুয়ারির আগে) মন্ত্রিসভার বৈঠকে আমার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, মহসিন ভাই সিগারেট একটু কম খেলে হয় না? এ সময় আমি কিছু বলতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরে আপনি কী বলবেন। যা বলে দিয়েছি সেটা করবেন।
বাংলার খবর ডেস্ক : 










