
মাসুদ সরকার: নওগাঁর মহাদেবপুরে ২০ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত ১০টায় উপজেলা সদর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী নাটশাল আদিবাসী পাড়ায় পুজার মূল পর্ব উদ্বোধন করেন মহাদেবপুরের সিনিয়র সাংবাদিক কিউ, এম, সাঈদ (টিটো)।
এসময় জাতীয় আদিবাসী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা অসিত দাস, মহাদেবপুর দর্পণের বার্তা সম্পাদক কাজী সামছুজ্জোহা মিলন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের কিশোরীরা সেজে-গুজে বিভিন্ন প্রজাতীর ফুল, ফল আর পিঠে-পুলির ডালায় সাজিয়ে শুরু করে পুজা অর্চনা।
মহাদেবপুর উপজেলার আদিবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলক উড়াও জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে কারাম পুজার উৎসব পালন করা হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে আদিবাসী মেয়েরা শালের দাঁতন দিয়ে দাঁত পরিস্কার করে পুকুরে স্নান শেষে যে জমিতে ভাল ফসল হয়েছে সে জমি থেকে সামান্য পরিমানে মাটি নিয়ে ডালায় ভর্তি করেন। তারা জাওয়া গান গাইতে গাইতে ডালার চারিদিকে তিন পাক ঘোরে। এরপর তাতে তেল ও হলুদ দিয়ে মটর, মুগ, বুট ও বিভিন্ন ফসলের বীজ একত্রিত করে মাখিয়ে নেয়। আদিবাসী কুমারী মেয়েরা স্নান শেষে ভিজে কাপড়ে শাল পাতার বীজগুলো রেখে সিঁদুর ও কাজলের ৩ টি দাগ দেয়। এ দাগের নাম বাগাল জাওয়া। ওই মেয়েদেরকে বলা হয়ে থাকে জাওয়ার মা। এরপর টুপা ও ডালাতে বীজ বোনা হয়। বাগাল জাওয়া ক্ষেতের পাশে লুকিয়ে রেখে টুপা ও ডালার জাওয়া নিয়ে কুমারীরা বাড়িতে ফিরে আসেন। ৫ টি ঝিঙাপাতা উল্টো করে প্রতি পাতায় একটি করে দাঁতনকাঠি রেখে বেদি তৈরি করেন।
তিনি জানান, সোমবার বিকেলে আদিবাসী পুরুষেরা নানান আচার পালন করে মাদল, ঢোল, করতাল ও ঝুমকির বাজনার তালে তালে নেচে-গেয়ে কারাম গাছের (খিল কদম) ডাল কেটে এনে বেদিতে পুতে দেন। কিশোরী মেয়েরা সূর্যোদয় থেকে উপোস থেকে রাতে ফুল, ফলে ভরা নৈবেদ্য সাজিয়ে বেদির চারপাশে বসে পুজা অর্চনা শুরু করেন। পুজা শেষে রাতভর চলে আদিবাসী নারী-পুরুষরা ঐতিহ্যবাহী নাচ গান। গানে গানে তারা উৎসবের বিষয় ও সমসাময়িক নানান বিষয় তুলে ধরেন। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে সুখ, সমৃদ্ধি, ভালবাসা আর ভাল ফসল উৎপাদনের কামনা করেন।
বয়োবৃদ্ধ আদিবাসী নগেন কুজুর জানান, বিপদ-আপদ ও অভাব-অনটন থেকে রক্ষা পাওয়ার লক্ষ্যে মূলত এই কারাম পূজা পালন করা হয়। কথিত আছে আদিবাসীদের দুই সহোদর ধর্মা ও কর্মা। ধর্মা কারাম গাছকে পূজা করতেন। কিন্তু কর্মা পুজা করতেন না। কর্মা একদিন পুজার কারাম গাছ তুলে নদীতে ফেলে দেন। এরপর তিনি নানান বিপদ-আপদ আর অভাব অনটনে পড়েন। কর্মা আবার সেই গাছ খুঁজে এনে পুজা শুরু করলে তার অভাব দূর হয়।
আদিবাসী নেতা নরেশ উড়াও জানান, পুজা শেষে উপোস থাকা আদিবাসী কিশোরীরা পাকান পিঠা, চিতুই পিঠা, কুশলী পিঠা প্রভৃতি নানান উন্নত খাবার নিয়ে পরস্পরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভাঙ্গে। শেষে নিজেদের মধ্যে সংগ্রহ করা চাল, ডালে দিয়ে তৈরি করা খিচুড়ি দিয়ে উপস্থিত স্বজন ও অতিথিদের আপ্যায়ন করেন।
আদিবাসী নেতা অসিত দাস জানান, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের বাৎসরিক কারাম উৎসব পালিত হলেও এখন মূলত তারা এই উৎসবকে ঘিরে সরকারের কাছে আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান। এছাড়া আদিবাসীদের ভাষা চর্চা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাংলার খবর ডেস্ক : 










