পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল
শিরোনাম :
Logo বাউফলে সাংবাদিক এনাকে সংবাদ প্রকাশে বাধা ও মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগ Logo কায়েতপাড়া ভিটা-মাটি ও ফসলি জমি রক্ষার দাবিতে ১০ গ্রামের বিক্ষোভ, কোম্পানি ও প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত। Logo পাটগ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু Logo সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগদখল থাকবে বাবা-মায়ের: আইনমন্ত্রী Logo আজ থেকে আর কোনো কথা বলব না, চুপ থাকব: নাসীরুদ্দীন Logo আগে যারা ঘুষ খেত, তারাই এখন বড় জুলাই আন্দোলনকারী সেজেছে: মির্জা ফখরুল Logo এনসিপি নেতাদের মানুষ ঝেঁটিয়ে বিদায় করছে না, এটাই তাদের সৌভাগ্য: রাশেদ খাঁন Logo ঢাকায় প্রেমিকাকে ৪ দিন আটকে রেখে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ Logo আরেকজনের ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা দিতে এসে বড় বিপদে যুবক Logo সরকারি চাকরিজীবীদের টানা ৪ দিনের ছুটির সুযোগ

চরভদ্রাসনে চরের মানুষ সন্ধ্যা হলেই জীবন বাঁচাতে ঘরে ফিরে

ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি-

পদ্মার চরে ভাঙাগড়ার অবিরাম লড়াই চলে মানুষের। কখনো কারো পাকা ধান বন্যায় ভেসে যায় আবার কখনো বসতভিটা হারিয়ে যায় পদ্মার বুকে। এমনই একটি চর গোপালপুর। ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার ঝাউকান্দি ইউনিয়নে অবস্থিত।
কয়েক বছর ধরে পদ্মার চরে সাপের আতঙ্কে আছে মানুষ। কেউ গরু আনতে গিয়ে বা ফসল কাটতে গিয়ে সাপের কামড়ে প্রাণ হারিয়েছে। সাপ নিয়ে চরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে অনেকে বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। সন্ধ্যা হলেই জীবন বাঁচাতে ঘরবন্দি থাকছে চরের মানুষ।
একসময় ভয় আর আতঙ্ক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মুখে মুখে গোপালপুর চরের নাম হয়ে যায় সাপের চর! কৌতূহলবশত গত মাসের শেষের দিকে এই চরে গেলাম মুন্সী এনায়েত ও সাংবাদিক আবদুস সবুর মোল্লা ওরফে গামছা কাজলের সঙ্গে। কাজল ভাই মানুষের মধ্যে সাপ নিয়ে সচেতনতামূলক কাজও করেন।
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন পর্যন্ত গেলাম সড়কপথে। পরে কাজিবাড়ির ঘাট থেকে ট্রলারে।

চরের রাস্তায় পা দিয়েই টের পেলাম, যেন সাপের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মানুষ। বর্ষায় আশপাশের ফসলের মাঠ থেকে সাপ উঠে আসবে লোকালয়ে—এই আশঙ্কায় বিষ দিয়ে রাস্তার পাশের ঘাস পর্যন্ত মেরে ফেলেছে চরবাসী।
শতাধিক পরিবারের বাস এই চরে। কৃষি, মাছ ধরা ও গবাদি পশুর দুধ শহরে এনে বিক্রি করা তাদের প্রধান পেশা। পদ্মার পানি বাড়ছে, ধীরে ধীরে চরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাপও ঢুকতে শুরু করেছে লোকালয়ে। দেখলাম, ভয়ডর নিয়েই জীবিকার তাগিদে কেউ যাচ্ছে কষ্টে ফলানো ফসল কাটতে, কেউ মাছ ধরতে আবার কেউ বা যাচ্ছে গরু চরাতে। কৃষক ধারদেনা করে ফসল ফলিয়েছেন। তবে ফসল কাটার শ্রমিকসংকটে সত্যিকারের বিপদে পড়েছেন তাঁরা।

শ্রমিকরা তো বটেই, সাপের ভয়ে কৃষকদের অনেকে মাঠে যাওয়া বাদ দিয়েছেন, অনেকেই যাচ্ছেন গামবুট পরে। দূর থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের কেউ একজন সাপের কামড়ে মারা গেছে বলে জানলাম। ভয়ে কাজ না করে চলে গেছেন অনেক শ্রমিক। ফলে বাইরে থেকে এখন চরে কেউ কাজ করতে আসতে চাচ্ছেন না। বাধ্য হয়েই কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে মাঠে কাজ করছেন চাষিরা।

এই চরে ২০১৮ সালে সাপের কামড়ে প্রথম মারা যান ফরহাদ। তাঁর বাড়িতে গেলাম। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ছয় বছরে ধরে চোখের জল মুছছেন মা পানুতি বেগম। শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বাবা নালু মোল্লা। চরের কয়েকটি পরিবারের গল্প একই রকম। সাপের কামড় খাওয়া সুখা মুন্সীকে বাঁচানো গেলেও রোকন মুন্সীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। স্বামীর মৃত্যুর পর সাপের আতঙ্ক ও ভয়ে ঘরবাড়ি ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন রোকন মুন্সীর স্ত্রী হায়াতুন্নেছা।

আড়াই মাস ধরে চিকিৎসার পরও বাঁচানো যায়নি হারুন মুন্সীকে। চরে পাট কাটতে এসে সাপের কামড় খেয়েছেন পাশের ডাঙ্গী গ্রামের রহিম মোল্লা। আট বছর ধরে সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

এই চরে বসবাস করা শতাধিক পরিবারের চোখেমুখে সাপ নিয়ে ভয় আর আতঙ্ক। চরের এক মাথায় হারুন মোল্লা ওরফে হারুন সাধুর বাড়ি। তিনি যে বাড়িতে থাকেন তাঁর ভাষায় সেটি ‘সাপের অভয়াশ্রম’। ‘মাঠে নামলে সাপ, রাস্তা দিয়ে হাঁটলেও সাপ। সন্ধ্যার পরে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অন্যান্যবারের তুলনায় এবার সাপের উপদ্রব বেশি।’ চোখেমুখে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে বলছিলেন গোপালপুর চরের দোকানদার চান মিয়া।

এখনো ওঝার ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস করে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ। তাই তো সাপের কামড়ে যাতে কারো মৃত্যু না হয় সে জন্য পঞ্চাশোর্ধ্ব ইয়াকুব তালুকদার শিখে রেখেছেন মন্ত্র। আমাদেরও শোনালেন সেই মন্ত্র।

‘এ পর্যন্ত চরের পাঁচজন মানুষ মারা গেছে সাপের কামড়ে। তাই ভয়ে চর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে অনেকেই। এখন আমরা সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাস করছি।’ এমনটি বললেন ঝাউকান্দি ইউনিয়নের নারী সদস্য লাইলি বেগম।

এরই মধ্যে খবর এলো, একটি গোখরা সাপ মারা হয়েছে কাছের এক বাড়িতে। দেখা গেল, গোখরা ভেবে চিলেপোড়া (হেলে) সাপ মেরে ফেলেছে মানুষ। আদতে সাপটি নির্বিষ। কিন্তু চরজুড়ে খবর ছড়িয়েছে বিষধর গোখরা সাপা মারা হয়েছে। বোঝা গেল, কোন সাপে বিষ আছে আর কোন সাপে নেই তা না জানার কারণেই মারা পড়ছে সব সাপ। আতঙ্ক ও অসচেতনতায় মারা হচ্ছে শঙ্খিনী, অজগর, ঘরগিন্নি, দারাজ, ঢোঁড়া সাপের মতো বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।

ঝাউকান্দি ইউনিয়নে কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। ওঝাদের কাছে যাওয়া, সঠিক সময়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারার জন্য মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে। ফেরার সময় গামছা কাজল বলছিলেন, ‘চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার বেড়েছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি আতঙ্ক ছড়িয়েছে কয়েক গুণ বেশি। নানামুখী সচেতনতামূলক কার্যক্রম এই বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে।’

Tag :

বাউফলে সাংবাদিক এনাকে সংবাদ প্রকাশে বাধা ও মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগ

চরভদ্রাসনে চরের মানুষ সন্ধ্যা হলেই জীবন বাঁচাতে ঘরে ফিরে

আপডেট টাইম : ০৭:৪১:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৪

ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি-

পদ্মার চরে ভাঙাগড়ার অবিরাম লড়াই চলে মানুষের। কখনো কারো পাকা ধান বন্যায় ভেসে যায় আবার কখনো বসতভিটা হারিয়ে যায় পদ্মার বুকে। এমনই একটি চর গোপালপুর। ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার ঝাউকান্দি ইউনিয়নে অবস্থিত।
কয়েক বছর ধরে পদ্মার চরে সাপের আতঙ্কে আছে মানুষ। কেউ গরু আনতে গিয়ে বা ফসল কাটতে গিয়ে সাপের কামড়ে প্রাণ হারিয়েছে। সাপ নিয়ে চরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে অনেকে বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। সন্ধ্যা হলেই জীবন বাঁচাতে ঘরবন্দি থাকছে চরের মানুষ।
একসময় ভয় আর আতঙ্ক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মুখে মুখে গোপালপুর চরের নাম হয়ে যায় সাপের চর! কৌতূহলবশত গত মাসের শেষের দিকে এই চরে গেলাম মুন্সী এনায়েত ও সাংবাদিক আবদুস সবুর মোল্লা ওরফে গামছা কাজলের সঙ্গে। কাজল ভাই মানুষের মধ্যে সাপ নিয়ে সচেতনতামূলক কাজও করেন।
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন পর্যন্ত গেলাম সড়কপথে। পরে কাজিবাড়ির ঘাট থেকে ট্রলারে।

চরের রাস্তায় পা দিয়েই টের পেলাম, যেন সাপের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মানুষ। বর্ষায় আশপাশের ফসলের মাঠ থেকে সাপ উঠে আসবে লোকালয়ে—এই আশঙ্কায় বিষ দিয়ে রাস্তার পাশের ঘাস পর্যন্ত মেরে ফেলেছে চরবাসী।
শতাধিক পরিবারের বাস এই চরে। কৃষি, মাছ ধরা ও গবাদি পশুর দুধ শহরে এনে বিক্রি করা তাদের প্রধান পেশা। পদ্মার পানি বাড়ছে, ধীরে ধীরে চরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাপও ঢুকতে শুরু করেছে লোকালয়ে। দেখলাম, ভয়ডর নিয়েই জীবিকার তাগিদে কেউ যাচ্ছে কষ্টে ফলানো ফসল কাটতে, কেউ মাছ ধরতে আবার কেউ বা যাচ্ছে গরু চরাতে। কৃষক ধারদেনা করে ফসল ফলিয়েছেন। তবে ফসল কাটার শ্রমিকসংকটে সত্যিকারের বিপদে পড়েছেন তাঁরা।

শ্রমিকরা তো বটেই, সাপের ভয়ে কৃষকদের অনেকে মাঠে যাওয়া বাদ দিয়েছেন, অনেকেই যাচ্ছেন গামবুট পরে। দূর থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের কেউ একজন সাপের কামড়ে মারা গেছে বলে জানলাম। ভয়ে কাজ না করে চলে গেছেন অনেক শ্রমিক। ফলে বাইরে থেকে এখন চরে কেউ কাজ করতে আসতে চাচ্ছেন না। বাধ্য হয়েই কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে মাঠে কাজ করছেন চাষিরা।

এই চরে ২০১৮ সালে সাপের কামড়ে প্রথম মারা যান ফরহাদ। তাঁর বাড়িতে গেলাম। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ছয় বছরে ধরে চোখের জল মুছছেন মা পানুতি বেগম। শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বাবা নালু মোল্লা। চরের কয়েকটি পরিবারের গল্প একই রকম। সাপের কামড় খাওয়া সুখা মুন্সীকে বাঁচানো গেলেও রোকন মুন্সীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। স্বামীর মৃত্যুর পর সাপের আতঙ্ক ও ভয়ে ঘরবাড়ি ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন রোকন মুন্সীর স্ত্রী হায়াতুন্নেছা।

আড়াই মাস ধরে চিকিৎসার পরও বাঁচানো যায়নি হারুন মুন্সীকে। চরে পাট কাটতে এসে সাপের কামড় খেয়েছেন পাশের ডাঙ্গী গ্রামের রহিম মোল্লা। আট বছর ধরে সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

এই চরে বসবাস করা শতাধিক পরিবারের চোখেমুখে সাপ নিয়ে ভয় আর আতঙ্ক। চরের এক মাথায় হারুন মোল্লা ওরফে হারুন সাধুর বাড়ি। তিনি যে বাড়িতে থাকেন তাঁর ভাষায় সেটি ‘সাপের অভয়াশ্রম’। ‘মাঠে নামলে সাপ, রাস্তা দিয়ে হাঁটলেও সাপ। সন্ধ্যার পরে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অন্যান্যবারের তুলনায় এবার সাপের উপদ্রব বেশি।’ চোখেমুখে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে বলছিলেন গোপালপুর চরের দোকানদার চান মিয়া।

এখনো ওঝার ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস করে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ। তাই তো সাপের কামড়ে যাতে কারো মৃত্যু না হয় সে জন্য পঞ্চাশোর্ধ্ব ইয়াকুব তালুকদার শিখে রেখেছেন মন্ত্র। আমাদেরও শোনালেন সেই মন্ত্র।

‘এ পর্যন্ত চরের পাঁচজন মানুষ মারা গেছে সাপের কামড়ে। তাই ভয়ে চর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে অনেকেই। এখন আমরা সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাস করছি।’ এমনটি বললেন ঝাউকান্দি ইউনিয়নের নারী সদস্য লাইলি বেগম।

এরই মধ্যে খবর এলো, একটি গোখরা সাপ মারা হয়েছে কাছের এক বাড়িতে। দেখা গেল, গোখরা ভেবে চিলেপোড়া (হেলে) সাপ মেরে ফেলেছে মানুষ। আদতে সাপটি নির্বিষ। কিন্তু চরজুড়ে খবর ছড়িয়েছে বিষধর গোখরা সাপা মারা হয়েছে। বোঝা গেল, কোন সাপে বিষ আছে আর কোন সাপে নেই তা না জানার কারণেই মারা পড়ছে সব সাপ। আতঙ্ক ও অসচেতনতায় মারা হচ্ছে শঙ্খিনী, অজগর, ঘরগিন্নি, দারাজ, ঢোঁড়া সাপের মতো বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।

ঝাউকান্দি ইউনিয়নে কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। ওঝাদের কাছে যাওয়া, সঠিক সময়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারার জন্য মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে। ফেরার সময় গামছা কাজল বলছিলেন, ‘চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার বেড়েছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি আতঙ্ক ছড়িয়েছে কয়েক গুণ বেশি। নানামুখী সচেতনতামূলক কার্যক্রম এই বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে।’