পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল
শিরোনাম :
Logo পাটগ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু Logo সম্পত্তি লিখে দিলেও ভোগদখল থাকবে বাবা-মায়ের: আইনমন্ত্রী Logo আজ থেকে আর কোনো কথা বলব না, চুপ থাকব: নাসীরুদ্দীন Logo আগে যারা ঘুষ খেত, তারাই এখন বড় জুলাই আন্দোলনকারী সেজেছে: মির্জা ফখরুল Logo এনসিপি নেতাদের মানুষ ঝেঁটিয়ে বিদায় করছে না, এটাই তাদের সৌভাগ্য: রাশেদ খাঁন Logo ঢাকায় প্রেমিকাকে ৪ দিন আটকে রেখে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ Logo আরেকজনের ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা দিতে এসে বড় বিপদে যুবক Logo সরকারি চাকরিজীবীদের টানা ৪ দিনের ছুটির সুযোগ Logo হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে স্বামীর ছুরিকাঘাতে গৃহবধূ নিহত, আটক স্বামী Logo ঢাকায় সন্ধ্যার মধ্যে বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস

রমজানে লেবুর দাম বেড়ে তিনগুণ রংপুরে চাষিদের মুখে হাসি, চরম হতাশ ক্রেতারা

নিজস্ব সংবাদদাতা

রমজানকে ঘিরে রংপুর অঞ্চলের হাট-বাজারে লেবুর দামে হঠাৎ অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। রমজানের এক সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রতিটি লেবু বিক্রি হচ্ছিল ৫ থেকে ৬ টাকায়, রমজান শুরুর একদিন আগে থেকেই সেই লেবু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা দরে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।
এরও আগে, জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিটি লেবু বিক্রি হয়েছিল মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। সেই তুলনায় বর্তমান দাম ক্রেতাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। লেবুর দাম বাড়ায় উৎপাদনকারী চাষিরা সন্তুষ্ট হলেও সাধারণ ক্রেতারা চরম হতাশায় পড়েছেন। অনেকেই প্রয়োজনের অর্ধেক লেবু কিনে বাড়ি ফিরছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য সময়ের তুলনায় রমজান মাসে লেবুর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ইফতার ও সেহরিতে লেবুর ব্যবহার বেশি হওয়ায় বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধায়—প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারের বসতভিটায় ৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত লেবু গাছ রয়েছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে লেবু চাষ শুরু করেছেন। একটি বাণিজ্যিক বাগানে সাধারণত ২০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত লেবু গাছ থাকে। পুরো অঞ্চলে প্রায় এক হাজারের মতো লেবুর বাগান রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি গাছে মৌসুমভেদে ২০০ থেকে ৮০০টি পর্যন্ত লেবু ধরে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর এলাকার লেবু চাষি আহসানুল কবির জানান, তার দুটি বাগানে মোট ৮০০টি লেবু গাছ রয়েছে। বর্তমানে সব গাছেই লেবু রয়েছে।
তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত লেবুর ফলন তুলনামূলক কম থাকে। এ সময় মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফলন পাওয়া যায়। মার্চের মাঝামাঝি থেকে আবার ফলন বাড়তে শুরু করে। বর্তমান বাজারদরে আমরা খুবই খুশি। তবে লেবুর দাম এতটা বাড়বে, এটা সত্যিই ভাবিনি। সবজি বিক্রেতারা খেত থেকে ১১-১২ টাকা দরে লেবু কিনে নিচ্ছেন।”

রংপুর সদর উপজেলার মাহিগঞ্জ এলাকার কৃষক সুবল চন্দ্র সেনের কোনো বাণিজ্যিক বাগান নেই। তবে তার বসতভিটার চারপাশে ২০টি লেবু গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছে প্রায় ৩০০টি করে লেবু ধরেছে।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০টি লেবু বিক্রি করছি। এবছর লেবু বিক্রি করে বেশ লাভবান হচ্ছি।”
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চায়নাবাজার এলাকার কৃষক শামসুল হক জানান, তিন বছর ধরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে লেবু চাষ করছেন। তার বাগানে ৩৫০টি গাছ রয়েছে।
“গত বছরের তুলনায় এবছর সবচেয়ে বেশি দাম পাচ্ছি। রংপুর থেকে সবজি বিক্রেতারা এসে বাগান থেকে লেবু কিনছেন। এ সময় ফলন কম হলেও দাম বেশি হওয়ায় আমরা বেশি লাভবান হচ্ছি,” বলেন তিনি।

রংপুর পৌর বাজারে কেনাকাটা করতে আসা কলেজ শিক্ষক ফেরদৌস হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক সপ্তাহ আগে যে লেবু ৫ টাকা দরে কিনেছি, সেটাই এখন ১৫ টাকা। বাজারে এসে মাথায় হাত দিতে হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পরিবারে প্রতিদিন এক ডজন লেবুর প্রয়োজন হয়। এখন দাম বেড়ে যাওয়ায় ৬টি দিয়ে চালাতে হচ্ছে।”

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ক্রেতাই এখন প্রয়োজনের অর্ধেক লেবু কিনছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।

রংপুর পৌর বাজারের সবজি পাইকার রহিদুল ইসলাম জানান, “বর্তমানে যে পরিমাণ চাহিদা, সে পরিমাণ সরবরাহ নেই। এক মাস আগেও আমরা এখান থেকে অন্য জেলায় লেবু পাঠাতাম। এখন অন্য জেলা থেকে লেবু আনতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “গ্রাম এলাকা থেকে কৃষকদের কাছ থেকে লেবু কিনে আনছি। আমরা প্রতিটি লেবুতে এক টাকা লাভ করছি। খুচরা বিক্রেতারা ২-৩ টাকা লাভ করছেন। এক সপ্তাহ পরে দাম আরও বাড়তে পারে। ক্রেতাদের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারছি না।”

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত লেবুর ফলন কম থাকে। এ সময় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফলন পাওয়া যায়। রমজানে লেবুর চাহিদা বেশি থাকায় বাজারে দাম অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “দাম বেশি থাকায় অনেক কৃষক অপরিপক্ক লেবুও বাজারে বিক্রি করছেন। এতে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে গাছের ক্ষতি হতে পারে। ক্রেতারা হতাশ হলেও কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।”

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

পাটগ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

রমজানে লেবুর দাম বেড়ে তিনগুণ রংপুরে চাষিদের মুখে হাসি, চরম হতাশ ক্রেতারা

আপডেট টাইম : ০৬:৫৮:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব সংবাদদাতা

রমজানকে ঘিরে রংপুর অঞ্চলের হাট-বাজারে লেবুর দামে হঠাৎ অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। রমজানের এক সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রতিটি লেবু বিক্রি হচ্ছিল ৫ থেকে ৬ টাকায়, রমজান শুরুর একদিন আগে থেকেই সেই লেবু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা দরে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।
এরও আগে, জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিটি লেবু বিক্রি হয়েছিল মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। সেই তুলনায় বর্তমান দাম ক্রেতাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। লেবুর দাম বাড়ায় উৎপাদনকারী চাষিরা সন্তুষ্ট হলেও সাধারণ ক্রেতারা চরম হতাশায় পড়েছেন। অনেকেই প্রয়োজনের অর্ধেক লেবু কিনে বাড়ি ফিরছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য সময়ের তুলনায় রমজান মাসে লেবুর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ইফতার ও সেহরিতে লেবুর ব্যবহার বেশি হওয়ায় বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধায়—প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারের বসতভিটায় ৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত লেবু গাছ রয়েছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে লেবু চাষ শুরু করেছেন। একটি বাণিজ্যিক বাগানে সাধারণত ২০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত লেবু গাছ থাকে। পুরো অঞ্চলে প্রায় এক হাজারের মতো লেবুর বাগান রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি গাছে মৌসুমভেদে ২০০ থেকে ৮০০টি পর্যন্ত লেবু ধরে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর এলাকার লেবু চাষি আহসানুল কবির জানান, তার দুটি বাগানে মোট ৮০০টি লেবু গাছ রয়েছে। বর্তমানে সব গাছেই লেবু রয়েছে।
তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত লেবুর ফলন তুলনামূলক কম থাকে। এ সময় মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফলন পাওয়া যায়। মার্চের মাঝামাঝি থেকে আবার ফলন বাড়তে শুরু করে। বর্তমান বাজারদরে আমরা খুবই খুশি। তবে লেবুর দাম এতটা বাড়বে, এটা সত্যিই ভাবিনি। সবজি বিক্রেতারা খেত থেকে ১১-১২ টাকা দরে লেবু কিনে নিচ্ছেন।”

রংপুর সদর উপজেলার মাহিগঞ্জ এলাকার কৃষক সুবল চন্দ্র সেনের কোনো বাণিজ্যিক বাগান নেই। তবে তার বসতভিটার চারপাশে ২০টি লেবু গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছে প্রায় ৩০০টি করে লেবু ধরেছে।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০টি লেবু বিক্রি করছি। এবছর লেবু বিক্রি করে বেশ লাভবান হচ্ছি।”
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চায়নাবাজার এলাকার কৃষক শামসুল হক জানান, তিন বছর ধরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে লেবু চাষ করছেন। তার বাগানে ৩৫০টি গাছ রয়েছে।
“গত বছরের তুলনায় এবছর সবচেয়ে বেশি দাম পাচ্ছি। রংপুর থেকে সবজি বিক্রেতারা এসে বাগান থেকে লেবু কিনছেন। এ সময় ফলন কম হলেও দাম বেশি হওয়ায় আমরা বেশি লাভবান হচ্ছি,” বলেন তিনি।

রংপুর পৌর বাজারে কেনাকাটা করতে আসা কলেজ শিক্ষক ফেরদৌস হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক সপ্তাহ আগে যে লেবু ৫ টাকা দরে কিনেছি, সেটাই এখন ১৫ টাকা। বাজারে এসে মাথায় হাত দিতে হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পরিবারে প্রতিদিন এক ডজন লেবুর প্রয়োজন হয়। এখন দাম বেড়ে যাওয়ায় ৬টি দিয়ে চালাতে হচ্ছে।”

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ক্রেতাই এখন প্রয়োজনের অর্ধেক লেবু কিনছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।

রংপুর পৌর বাজারের সবজি পাইকার রহিদুল ইসলাম জানান, “বর্তমানে যে পরিমাণ চাহিদা, সে পরিমাণ সরবরাহ নেই। এক মাস আগেও আমরা এখান থেকে অন্য জেলায় লেবু পাঠাতাম। এখন অন্য জেলা থেকে লেবু আনতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “গ্রাম এলাকা থেকে কৃষকদের কাছ থেকে লেবু কিনে আনছি। আমরা প্রতিটি লেবুতে এক টাকা লাভ করছি। খুচরা বিক্রেতারা ২-৩ টাকা লাভ করছেন। এক সপ্তাহ পরে দাম আরও বাড়তে পারে। ক্রেতাদের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারছি না।”

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত লেবুর ফলন কম থাকে। এ সময় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফলন পাওয়া যায়। রমজানে লেবুর চাহিদা বেশি থাকায় বাজারে দাম অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “দাম বেশি থাকায় অনেক কৃষক অপরিপক্ক লেবুও বাজারে বিক্রি করছেন। এতে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে গাছের ক্ষতি হতে পারে। ক্রেতারা হতাশ হলেও কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।”