পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল
শিরোনাম :
Logo শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজিত Logo পাটগ্রামে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত Logo প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সাইবার নিরাপত্তার জগতে নয়ন রায়ের এগিয়ে চলা Logo বিআরটিএ, ফরিদপুর সার্কেল কর্তৃক জাতীয় সড়ক নিরাপদ দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত Logo “জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা” বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলের Logo বিআরটিএ নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হেমায়েত হোসেন’কে নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার Logo বিআরটিএ নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হেমায়েত হোসেন’কে নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার Logo জমিজমার বিরোধকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার অভিযোগ Logo পাটগ্রামে ১৭ লাখের দেনমোহর কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার করার অভিযোগ, কাজির দুই সহযোগী আটক Logo লালমনিরহাটে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

মুক্তিপণ দিয়েও অপহরণকারীদের জন্য দোয়া করলেন মা

বাংলার খবর২৪.কমdsc09653_51351 : র‌্যাব ও পুলিশকে জানিয়েও অপহৃত ছেলেকে ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছিলেন না মা তামান্না বেগম। নিরুপায় হয়ে অপহরণকারীদের কথা মেনে নিয়ে আট লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে পান ছেলে মোস্তফা কাওসার বাপ্পিকে (৩০)।

শুধু অপহরণকারীদের মুক্তিপণ দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি; অপহরণকারীরা যাতে মুক্তিপণের টাকা নিয়ে নিরাপদে তাদের মায়ের কোলে ফিরে যেতে পারে সেজন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনাও করেছেন এই ভুক্তভোগী মা। কারণ অপহরণকারীরাও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান!

বুধবার রাতে কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে অপহৃত মোস্তফা কাওসার বাপ্পি অপহরণের দুই দিন পর আট লাখ টাকার বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছে শুক্রবার বিকেলে। শনিবার বিকেলে জুরাইনের খন্দকার রোডের ৩৬৬ নম্বর বাসায় (নিজ বাড়িতে) বসে বাপ্পির মা তামান্না বেগম এবং তার ছেলে অপহরণ ও উদ্ধার পরবর্তী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শীর্ষ নিউজের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘আট লাখ টাকা দিয়‍া আমি ওগো লাইগা দুই হাত তুইলা দুয়া করছি। যাতে ওরা সই-সালামতে ফিইরা যাইতে পারে। তারাও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। ওরা ওগো কথা রাখছে। কইছিল বিশ মিনিটের মধ্যে তাকে জীবিত ফেরত দিবে। ঠিকই বিশ মিনিটের মধ্যে পোলা ফোন দিছে।’

তামান্না বেগম বলেন, ‘হগল সময় র‌্যাব পুলিশের জন্য অপেক্ষা করা যায় না। কারণ ওরা ফোনে বলছিল টাকা না দিলে পোলার পেট ফাইরা বুড়িগঙ্গায় ভাসায়া দিবে। তাই ট্যাকা দিয়ে পোলারে ফেরত আনছি। পোলার বাপরে কইসি-যত টাকা পারো দাও। তবুও পোলারে ফেরত চাই।’

এদিকে বাপ্পি উদ্ধার হলেও তাদের পুরো পরিবারের আতঙ্ক এখনও কাটেনি। পুরো পরিবার এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নেই তাদের কোনো ভরসা। তামান্না বেগমের ধারণা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তার ছেলেরাতো বাইরে যায় আবার যদি এমন হয়। সেই আশঙ্কা থেকে অপহরণকারীদের বিষয় মুখ খুলতে চাননি বাপ্পির বাবা হাজী আব্দুল মান্নানও।

হাজী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বুধবার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে তার মেজো ছেলে মোস্তফা কাওসার বাপ্পিকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নেয় কয়েকজন যুবক। গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাপ্পির মায়ের মোবাইল ফোনে একটি অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন আসে। পরিচয় না জানিয়ে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় ছেলেকে বাঁচাতে হলে ২৫ লাখ টাকা দিতে হবে। পুলিশ র‌্যাব কাউকে জানানোর চেষ্টা করা হলে বুডিগঙ্গায় মিলবে ছেলের লাশ।

বাপ্পির বাবা আরো বলেন, ‘সন্তানের এমন খবর পেয়ে রাতেই ক্যান্টনমেন্ট থানায় যাই। সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ জানান, ওসি স্যারের অনুমতি ছাড়া জিডি নেওয়া যাবে না। হতাশ হয়ে ভোররাতে খিলক্ষেত থানায় বাপ্পি নিখোঁজ হয়েছে জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি করি। এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে র‌্যাব ১০ এর অফিসে গেলেও কোনো সহায়তা পাইনি। পরে ছুটে যাই র‌্যাব ১ এর অফিসে। সেখানে একটা লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করি।’

তিনি আরো জানান, দুইটি নম্বর থেকে অপহরণকারীরা যোগাযোগ করেছে। অপহরণকারীরা প্রথমে ২৫ লাখ টাকা চাইলেও বৃহস্পতিবার রাতে তারা শেষ পর্যন্ত আট লাখ টাকায় রাজি হয়। টাকা কিভাবে নিবে তা জানানো হয় পরদিন শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে। তাকে একা শাহবাগ থানার সামনে আসতে বলা হয়, বড় ছেলে হারুনুর রশীদকে গাড়ি চালিয়ে মাওয়া যেতে নির্দেশ দেন অপহরণকারীরা। অপহরণকারীদের কথা অনুযায়ী শাহবাগে টাকা নিয়ে ছুটে আসেন মান্নান। শাহবাগ থানার গেইটে একটি প্রাইভেট কারে তিন যুবক তাকে রিকশা নিয়ে টিএসসির দিকে যেতে বলেন। তাদের কথা মত তিনি রিকশা নিয়ে টিএসসিতে যান। সেখানে পৌঁছালে আবার ফোনে অপহরণকারীরা তাকে আরো সামনে দোয়েল চত্বরের দিকে যেতে বলে। তাকে আরো জানায় বাইকে থাকা দুইটি ছেলে সালাম দিলে টাকার প্যাকেটটি তাদের দিতে।

এভাবে একটানা ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকেন পরিবহন ব্যবসায়ী হাজী আবদুল মান্নান। পাশে থাকা স্ত্রী তামান্না বেগম আবারও কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শাহবাগে ফুলের দোকানের সামনে গিয়ে খুব কান্না পাইছিল। এমন একটা ঘটনায় আমাদের বললো ফুলের দোকানের সামনে যেতে। ফুল কিনতে যায় মানুষ কি পোশাক পইড়া আর আমি…’

এদিকে অপহরণকারীদের মুক্তিপণ দেওয়ার সময় র‌্যাব আব্দুল মান্নানকে ফোন দেয়। র‌্যাব ১ থেকে এক কর্মকর্তা জানতে চায় তিনি কোথায়, তিনি র‌্যাবকে মিথ্যা বলেন। র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা তাকে ফোনে বলেন, ‘আপনি তো টিএসসিতে। একটু আগে আপনি তো লাল মোটরসাইকেলে চড়া দুইজনকে টাকা দিলেন। ওরা টাকা নিয়ে চলে গেল। কত টাকা দিলেন ওদের। আমি এরপর বলি, আট লাখ টাকা। আমি কথা বাড়াইনি। ভয়ে ফোনের লাইন কেটে দেই।’

তারপরও আবারও ফোন দিয়ে অপহরণকারীরা বলেন, ‘বিশ মিনিটের মধ্যেই বাপ্পিকে ফেরত পাঠাবো আমরা।’

বাপ্পির বাবা আব্দুল মান্নানকে ঠিকই বিশ মিনিটের মাথায় এক সিএনজি চালিত অটোরিকশার চালক ফোন দিয়ে জানতে চায়, “বাপ্পি কি আপনার ছেলে? কারওয়ান বাজারে সে আছে। আপনারা কোথায়? আমরা শাহবাগ থানার সামনে বাপ্পিকে নিয়ে আসতে অনুরোধ করি। এরপর আধঘণ্টার মধ্যেই তাকে পাই। আমাকে দেখার কিছুক্ষণের ভেতর জ্ঞান হারায় বাপ্পি।”

মুক্তিপণ দেওয়ার সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কেনো জানালেন না? এ প্রশ্নের জবাবে বাপ্পির বড় ভাই হারুন অর রশিদ শীর্ষ নিউজকে বলেন, ‘অপহরণকারীরা বারবার বলছিল, আমরা সবাইরে ছিটাইয়া খাই। অপহরণ আমাদের পেশা। আমাদের বিষয়ে কাউকে কোনো অভিযোগ দিয়ে কাজ হবে না। কেউ আমাদের খুঁজে বের করবে না।’

মোস্তফা কাওসার বাপ্পি বলেন, “বুধবার খিলক্ষেত থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে একটা সাদা মাইক্রোতে করে কয়েক যুবক আমাকে তুলে নেয়। এরপর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিয়ে গাড়ি চলে বনানীর দিকে। তার কিছুক্ষণের ভেতরই আমি জ্ঞান হারাই।”

কতক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে তা মনে নেই। তবে আমি অনুভব করি আমার মুখে কাপড় গোজা। যেন শব্দ করতে না পারি। আমার চোখ বাঁধা ছিল। আমাকে বেল্ট দিয়ে পেটানো হয়। হাতে ইট দিয়ে আঘাত করা হয়।

প্রচণ্ড আহত হওয়ায় আমাকে পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে কথা বলতে বলা হয়। আমি ফোন দিয়ে দুইবার আম্মাকে বলেছিলাম, “আম্মা ওরা যা বলে তা মেনে নাও।”

শুক্রবার দুপুরে আমার বাসার লোকেরা ওদের টাকা দেবার পরই ওরা একটা রুম থেকে আমাকে বের করে। মাত্র একটি সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে একটি গাড়িতে তোলা হয়েছিল। এরপর কারওয়ান বাজারের কাছে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হয়।

যে কক্ষে বাপ্পিকে রাখা হয়েছিল, সেই কক্ষের বর্ণনা দিয়ে বাপ্পি বলেন, ‘রুমটির আশপাশে আরো কয়েকটি রুম ছিল। এজন্য আমাকে পেটে ছুরি ঠেকিয়ে কোনো ধরণের শব্দ না করতে বলা হতো। নিচু একটা কাঠের চেয়ারে বা টেবিলে আমার হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে বসিয়ে রাখা হতো। সেখান থেকে গাড়ি চলাচলের শব্দ পাওয়া যেত। ওদের সবার হাতে অস্ত্র ছিল।’

খিলক্ষেত থানার ওসি নজরুল ইসলাম অপহরণের বিষয়টি স্বীকার করে শীর্ষ নিউজকে জানান, গত বুধবার ভোররাতে মোস্তফা কাউসার বাপ্পি নামের একজন অপহরণ হয়েছিল বলে তার পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিল। শুক্রবার তাকে অপহরণকারীরা পরিবারের কাছে ফেরত দিয়েছে এটাও পুলিশকে জানিয়েছে তারা।

র‌্যাব ১ এর সিও তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ জানান, বাপ্পির পরিবার র‌্যাবকে জানিয়েছে তারা তাদের সন্তানকে ফেরত পেয়েছে। তবে তারা মুক্তিপণ দিয়েছে কিনা তা বলেনি। এ অপহরণের সঙ্গে কারা জড়িত তা তদন্ত করে দেখবে র‌্যাব।

তিনি আরো জানান, বাপ্পি সুস্থ হলে তার কাছ থেকে অপহরণের বিস্তারিত জানা হবে।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজিত

মুক্তিপণ দিয়েও অপহরণকারীদের জন্য দোয়া করলেন মা

আপডেট টাইম : ০৩:৫১:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪

বাংলার খবর২৪.কমdsc09653_51351 : র‌্যাব ও পুলিশকে জানিয়েও অপহৃত ছেলেকে ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছিলেন না মা তামান্না বেগম। নিরুপায় হয়ে অপহরণকারীদের কথা মেনে নিয়ে আট লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে পান ছেলে মোস্তফা কাওসার বাপ্পিকে (৩০)।

শুধু অপহরণকারীদের মুক্তিপণ দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি; অপহরণকারীরা যাতে মুক্তিপণের টাকা নিয়ে নিরাপদে তাদের মায়ের কোলে ফিরে যেতে পারে সেজন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনাও করেছেন এই ভুক্তভোগী মা। কারণ অপহরণকারীরাও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান!

বুধবার রাতে কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে অপহৃত মোস্তফা কাওসার বাপ্পি অপহরণের দুই দিন পর আট লাখ টাকার বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছে শুক্রবার বিকেলে। শনিবার বিকেলে জুরাইনের খন্দকার রোডের ৩৬৬ নম্বর বাসায় (নিজ বাড়িতে) বসে বাপ্পির মা তামান্না বেগম এবং তার ছেলে অপহরণ ও উদ্ধার পরবর্তী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শীর্ষ নিউজের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘আট লাখ টাকা দিয়‍া আমি ওগো লাইগা দুই হাত তুইলা দুয়া করছি। যাতে ওরা সই-সালামতে ফিইরা যাইতে পারে। তারাও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। ওরা ওগো কথা রাখছে। কইছিল বিশ মিনিটের মধ্যে তাকে জীবিত ফেরত দিবে। ঠিকই বিশ মিনিটের মধ্যে পোলা ফোন দিছে।’

তামান্না বেগম বলেন, ‘হগল সময় র‌্যাব পুলিশের জন্য অপেক্ষা করা যায় না। কারণ ওরা ফোনে বলছিল টাকা না দিলে পোলার পেট ফাইরা বুড়িগঙ্গায় ভাসায়া দিবে। তাই ট্যাকা দিয়ে পোলারে ফেরত আনছি। পোলার বাপরে কইসি-যত টাকা পারো দাও। তবুও পোলারে ফেরত চাই।’

এদিকে বাপ্পি উদ্ধার হলেও তাদের পুরো পরিবারের আতঙ্ক এখনও কাটেনি। পুরো পরিবার এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নেই তাদের কোনো ভরসা। তামান্না বেগমের ধারণা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তার ছেলেরাতো বাইরে যায় আবার যদি এমন হয়। সেই আশঙ্কা থেকে অপহরণকারীদের বিষয় মুখ খুলতে চাননি বাপ্পির বাবা হাজী আব্দুল মান্নানও।

হাজী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বুধবার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে তার মেজো ছেলে মোস্তফা কাওসার বাপ্পিকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নেয় কয়েকজন যুবক। গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাপ্পির মায়ের মোবাইল ফোনে একটি অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন আসে। পরিচয় না জানিয়ে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় ছেলেকে বাঁচাতে হলে ২৫ লাখ টাকা দিতে হবে। পুলিশ র‌্যাব কাউকে জানানোর চেষ্টা করা হলে বুডিগঙ্গায় মিলবে ছেলের লাশ।

বাপ্পির বাবা আরো বলেন, ‘সন্তানের এমন খবর পেয়ে রাতেই ক্যান্টনমেন্ট থানায় যাই। সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ জানান, ওসি স্যারের অনুমতি ছাড়া জিডি নেওয়া যাবে না। হতাশ হয়ে ভোররাতে খিলক্ষেত থানায় বাপ্পি নিখোঁজ হয়েছে জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি করি। এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে র‌্যাব ১০ এর অফিসে গেলেও কোনো সহায়তা পাইনি। পরে ছুটে যাই র‌্যাব ১ এর অফিসে। সেখানে একটা লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করি।’

তিনি আরো জানান, দুইটি নম্বর থেকে অপহরণকারীরা যোগাযোগ করেছে। অপহরণকারীরা প্রথমে ২৫ লাখ টাকা চাইলেও বৃহস্পতিবার রাতে তারা শেষ পর্যন্ত আট লাখ টাকায় রাজি হয়। টাকা কিভাবে নিবে তা জানানো হয় পরদিন শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে। তাকে একা শাহবাগ থানার সামনে আসতে বলা হয়, বড় ছেলে হারুনুর রশীদকে গাড়ি চালিয়ে মাওয়া যেতে নির্দেশ দেন অপহরণকারীরা। অপহরণকারীদের কথা অনুযায়ী শাহবাগে টাকা নিয়ে ছুটে আসেন মান্নান। শাহবাগ থানার গেইটে একটি প্রাইভেট কারে তিন যুবক তাকে রিকশা নিয়ে টিএসসির দিকে যেতে বলেন। তাদের কথা মত তিনি রিকশা নিয়ে টিএসসিতে যান। সেখানে পৌঁছালে আবার ফোনে অপহরণকারীরা তাকে আরো সামনে দোয়েল চত্বরের দিকে যেতে বলে। তাকে আরো জানায় বাইকে থাকা দুইটি ছেলে সালাম দিলে টাকার প্যাকেটটি তাদের দিতে।

এভাবে একটানা ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকেন পরিবহন ব্যবসায়ী হাজী আবদুল মান্নান। পাশে থাকা স্ত্রী তামান্না বেগম আবারও কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শাহবাগে ফুলের দোকানের সামনে গিয়ে খুব কান্না পাইছিল। এমন একটা ঘটনায় আমাদের বললো ফুলের দোকানের সামনে যেতে। ফুল কিনতে যায় মানুষ কি পোশাক পইড়া আর আমি…’

এদিকে অপহরণকারীদের মুক্তিপণ দেওয়ার সময় র‌্যাব আব্দুল মান্নানকে ফোন দেয়। র‌্যাব ১ থেকে এক কর্মকর্তা জানতে চায় তিনি কোথায়, তিনি র‌্যাবকে মিথ্যা বলেন। র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা তাকে ফোনে বলেন, ‘আপনি তো টিএসসিতে। একটু আগে আপনি তো লাল মোটরসাইকেলে চড়া দুইজনকে টাকা দিলেন। ওরা টাকা নিয়ে চলে গেল। কত টাকা দিলেন ওদের। আমি এরপর বলি, আট লাখ টাকা। আমি কথা বাড়াইনি। ভয়ে ফোনের লাইন কেটে দেই।’

তারপরও আবারও ফোন দিয়ে অপহরণকারীরা বলেন, ‘বিশ মিনিটের মধ্যেই বাপ্পিকে ফেরত পাঠাবো আমরা।’

বাপ্পির বাবা আব্দুল মান্নানকে ঠিকই বিশ মিনিটের মাথায় এক সিএনজি চালিত অটোরিকশার চালক ফোন দিয়ে জানতে চায়, “বাপ্পি কি আপনার ছেলে? কারওয়ান বাজারে সে আছে। আপনারা কোথায়? আমরা শাহবাগ থানার সামনে বাপ্পিকে নিয়ে আসতে অনুরোধ করি। এরপর আধঘণ্টার মধ্যেই তাকে পাই। আমাকে দেখার কিছুক্ষণের ভেতর জ্ঞান হারায় বাপ্পি।”

মুক্তিপণ দেওয়ার সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কেনো জানালেন না? এ প্রশ্নের জবাবে বাপ্পির বড় ভাই হারুন অর রশিদ শীর্ষ নিউজকে বলেন, ‘অপহরণকারীরা বারবার বলছিল, আমরা সবাইরে ছিটাইয়া খাই। অপহরণ আমাদের পেশা। আমাদের বিষয়ে কাউকে কোনো অভিযোগ দিয়ে কাজ হবে না। কেউ আমাদের খুঁজে বের করবে না।’

মোস্তফা কাওসার বাপ্পি বলেন, “বুধবার খিলক্ষেত থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে একটা সাদা মাইক্রোতে করে কয়েক যুবক আমাকে তুলে নেয়। এরপর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিয়ে গাড়ি চলে বনানীর দিকে। তার কিছুক্ষণের ভেতরই আমি জ্ঞান হারাই।”

কতক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে তা মনে নেই। তবে আমি অনুভব করি আমার মুখে কাপড় গোজা। যেন শব্দ করতে না পারি। আমার চোখ বাঁধা ছিল। আমাকে বেল্ট দিয়ে পেটানো হয়। হাতে ইট দিয়ে আঘাত করা হয়।

প্রচণ্ড আহত হওয়ায় আমাকে পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে কথা বলতে বলা হয়। আমি ফোন দিয়ে দুইবার আম্মাকে বলেছিলাম, “আম্মা ওরা যা বলে তা মেনে নাও।”

শুক্রবার দুপুরে আমার বাসার লোকেরা ওদের টাকা দেবার পরই ওরা একটা রুম থেকে আমাকে বের করে। মাত্র একটি সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে একটি গাড়িতে তোলা হয়েছিল। এরপর কারওয়ান বাজারের কাছে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হয়।

যে কক্ষে বাপ্পিকে রাখা হয়েছিল, সেই কক্ষের বর্ণনা দিয়ে বাপ্পি বলেন, ‘রুমটির আশপাশে আরো কয়েকটি রুম ছিল। এজন্য আমাকে পেটে ছুরি ঠেকিয়ে কোনো ধরণের শব্দ না করতে বলা হতো। নিচু একটা কাঠের চেয়ারে বা টেবিলে আমার হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে বসিয়ে রাখা হতো। সেখান থেকে গাড়ি চলাচলের শব্দ পাওয়া যেত। ওদের সবার হাতে অস্ত্র ছিল।’

খিলক্ষেত থানার ওসি নজরুল ইসলাম অপহরণের বিষয়টি স্বীকার করে শীর্ষ নিউজকে জানান, গত বুধবার ভোররাতে মোস্তফা কাউসার বাপ্পি নামের একজন অপহরণ হয়েছিল বলে তার পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিল। শুক্রবার তাকে অপহরণকারীরা পরিবারের কাছে ফেরত দিয়েছে এটাও পুলিশকে জানিয়েছে তারা।

র‌্যাব ১ এর সিও তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ জানান, বাপ্পির পরিবার র‌্যাবকে জানিয়েছে তারা তাদের সন্তানকে ফেরত পেয়েছে। তবে তারা মুক্তিপণ দিয়েছে কিনা তা বলেনি। এ অপহরণের সঙ্গে কারা জড়িত তা তদন্ত করে দেখবে র‌্যাব।

তিনি আরো জানান, বাপ্পি সুস্থ হলে তার কাছ থেকে অপহরণের বিস্তারিত জানা হবে।